চারজনের নাম এসআইআর-এর পর ভোটার তালিকায় ছিল এবং তাঁরা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটও দিয়েছিলেন
ইনসাফ নিউজ নেটওয়ার্ক
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মুর্শিদাবাদে প্রায় ৪০ দিন আগে একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের চার সদস্যকে সাদা পোশাকের পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এই ৪০ দিন ধরে তাঁদের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে এখন ‘স্ক্রল ডট ইন’-এর একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে ওই চারজনকে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ একই সঙ্গে দাবি করেছে, তাঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
৬০ বছর বয়সি ডাবলু শেখ এবং তাঁর তিন ছেলে—২৯ বছর বয়সি কায়েম শেখ, ২০ বছর বয়সি রেজাইল শেখ এবং ১৬ বছর বয়সি আসমাউল্লাহ শেখকে মুর্শিদাবাদের বালিয়া ঘাটি গ্রামের তাঁদের বাড়ি থেকে সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীরা আটক করেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম)-এর দাবি, ঘটনাটি ১৩ অথবা ১৪ আগস্ট রাতে ঘটেছিল। যদিও ডাবলু শেখের স্ত্রী চূড়ান্ত তারিখটি মনে করতে পারছেন না।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision)-এর পর ডাবলু শেখ এবং কায়েম শেখের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ছিল এবং তাঁরা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটও দিয়েছিলেন। এছাড়া ডাবলু শেখের বাবা শুক সমজানিও ১৯৬৬ এবং ১৯৯৫ সালে সুতী বিধানসভা কেন্দ্রের নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন।
ডাবলু শেখের স্ত্রী জাহানারা বিবি জানান, তাঁর স্বামী ও ছেলেদের আটক করার পর থেকে পুলিশ তাঁদের অবস্থান বা কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনও তথ্য দেয়নি। তাঁরা বাংলাদেশি—পুলিশের এই অভিযোগও তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
জাহানারা বিবি বলেন, “পুলিশ আমাদের জিজ্ঞাসা করেছিল, আমাদের কাছে বাংলাদেশের কোনও নথি আছে কি না। আমরা তাদের বলেছিলাম, বাংলাদেশ কোথায়, সেটাই আমরা জানি না। আমরা কখনও বাংলাদেশ দেখিনি।”
সুতী থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক অভিজিৎ বসু মল্লিক বলেন, ওই চারজনই বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন এবং তাঁদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করা হয়েছে। তবে ডাবলু শেখ ও তাঁর ছেলেদের সত্যিই বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
সুতী থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক অভিজিৎ বসু মল্লিককে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, ডাবলু শেখ, কায়েম শেখ এবং তাঁর অন্য দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনও এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল কি না, তিনি বলেন, “ফরেনার্স অ্যাক্টের অধীনে মামলা দায়ের করার প্রয়োজন নেই।” তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা একটি সার্কুলারের অধীনে তাঁদের আটক করে জঙ্গিপুরের একটি হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল।
মে মাসে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরপরই পশ্চিমবঙ্গ সরকার কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং “চিহ্নিত করো, নাম বাদ দাও, ডিপোর্ট করো”—এই নীতির আওতায় হোল্ডিং সেন্টার তৈরির কথা ঘোষণা করে।
জুন মাস থেকে এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ অন্তত ১০ জন মুসলিম পুরুষ এবং দুই শিশুকে আটক করেছে এবং তাঁদের বাংলাদেশি বলে অভিযোগ করেছে। ডাবলু শেখ ও তাঁর তিন ছেলের ঘটনা সামনে আসার পর এই ধরনের আটক হওয়া মানুষের মোট সংখ্যা ১৬-তে পৌঁছেছে।
‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রসচিবকে চিঠি দিয়ে ডাবলু শেখ ও তাঁর ছেলেদের অকারণ গ্রেফতার, বেআইনি আটক, তাঁদের বেআইনিভাবে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং কথিত ‘পুশব্যাক’-এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, তাদের হাতে এমন কিছু প্রমাণ এসেছে, যা ডাবলু শেখ ও তাঁর ছেলেরা বিদেশি নাগরিক—সরকারের এই দাবির বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
সংগঠনটি আরও উল্লেখ করেছে যে ভোটার তালিকায় এই পরিবারের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি এবং ভারতে তাঁদের নাগরিকত্বের দাবির পক্ষে নথি থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাঁদের ভুলভাবে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মাসুম আরও জানিয়েছে, আটক চারজনের কাছেই আধার কার্ড, রেশন কার্ড এবং বসবাসের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বৈধ নথি রয়েছে।
সংগঠনটি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, “এই পরিস্থিতি একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে। কোনও অস্পষ্ট প্রশাসনিক ঘোষণার মাধ্যমে একটি পরিবারকে একতরফাভাবে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়।”
২০২৫ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে নির্দেশ দিয়েছিল, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী বলে যাঁদের সন্দেহ করা হচ্ছে, তাঁদের তথ্য ও নথি যাচাই করতে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর থেকে বেশ কয়েকটি রাজ্যের পুলিশ—যার মধ্যে অধিকাংশই বিজেপি-শাসিত—বাংলাভাষী মানুষ, বিশেষ করে মুসলিমদের আটক করছে এবং তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে।
ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে জোর করে বাংলাদেশের সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে যাঁদের ভুলভাবে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, স্থানীয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার পর তাঁরা ভারতে ফিরে এসেছেন।
