প্রবল বৃষ্টির মধ্যে ভিড়ের চাপে বিশৃঙ্খলা, ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীদের। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে তদন্তের আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রীর। শোকপ্রকাশ মোদি, রাহুল গান্ধী-সহ একাধিক নেতার। রবিবারের কর্মসূচি বাতিল অমিত শাহের।
কলকাতা: ইনসাফ নিউজ নেটওয়ার্ক
কলকাতার উত্তর অংশের চোরবাগান দুর্গাপুজোর মণ্ডপে সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্ট হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। ঘটনার সময় প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। দুর্গাদর্শনের জন্য মণ্ডপে প্রচুর মানুষের ভিড় জমেছিল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আরও মানুষ মণ্ডপের ভিতরে জড়ো হওয়ায় ভিড়ের চাপ বাড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
শনিবার রাতে মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী ১৮ জনের মৃত্যু এবং ২৫ জনের আহত হওয়ার কথা জানান। আহতদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ-সহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার খবর পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনার পর চোরবাগানের পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শহরের অন্যান্য পুজোমণ্ডপেও নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রবল বৃষ্টিতে বাড়ে ভিড়ের চাপ
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে অনেকে মণ্ডপের ভিতরে থাকতে চাইছিলেন। অন্যদিকে, বাইরে থাকা দর্শনার্থীরাও ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। এর ফলে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয় এবং অনেকে একে অপরের উপর পড়ে যান। তবে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
চোখের সামনে মাকে হারালেন ছেলে
এই দুর্ঘটনায় কুমোরটুলির বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সি সোনু পালের মায়ের মৃত্যু হয়েছে। মায়ের সঙ্গে দুর্গাদর্শনে গিয়েছিলেন সোনু। তিনি জানান, ভিড়ের চাপে তিনিও আটকে পড়েছিলেন। কোনওরকমে নিজেকে সামলে মায়ের কাছে পৌঁছে দেখেন, তাঁর মা আর বেঁচে নেই। সোনুর কথায়, সেই পরিস্থিতিতে তাঁর নিজেরও বেঁচে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। পুলিশের উপস্থিতি এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়নি। প্রশাসন সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।
তদন্তের আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রীর
মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। তিনি জানান, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হবে। চোরবাগান ছাড়াও শহরের অন্যান্য বড় পুজোমণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রবিবারের কর্মসূচি বাতিল অমিত শাহের
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শনিবার কলকাতায় এসেছিলেন। রবিবার তাঁর বেলুড় মঠ, দেশবন্ধু ক্লাব, চেতলা ২৪ পল্লি, শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব-সহ একাধিক পুজোমণ্ডপে যাওয়ার কথা ছিল। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর তিনি রবিবারের সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করে আহতদের দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার কথা জানান। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেন।
মোদি, রাহুল গান্ধী ও খাড়্গের শোকপ্রকাশ
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এই দুর্ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন। তাঁরা মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সহযোগিতার জন্য তিনি কংগ্রেস কর্মীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গেও শোকপ্রকাশ করেছেন। তিনি আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতরা, চালু হেল্পলাইন
আহতদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, এসএসকেএম-সহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ১৩ জন মহিলা, তিনজন পুরুষ এবং একটি শিশু রয়েছে। তবে মৃত ও আহতদের চূড়ান্ত সংখ্যা এবং পরিচয় সম্পর্কে সরকারি নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন।
ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য ও সহায়তার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে।
হেল্পলাইন নম্বর: 18003455678
চোরবাগানের এই দুর্ঘটনা বড় ধর্মীয় সমাবেশে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা এবং পুলিশি নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে।
