দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের দুই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ: দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ আপত্তি মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে। প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর বললেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাখ্যা দিতে পারেননি উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক।
নয়াদিল্লি : ইনসাফ নিউজ নেটওয়ার্ক
উত্তরপ্রদেশে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে ঘিরে নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সংস্থা দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ ৯ ও ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার উত্তরপ্রদেশে ৮৫,৮৫৪ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য এমন ফর্ম তৈরি করেছিল, যেখানে নাম বাদ দেওয়ার কোনও স্পষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এই ফর্মগুলির অধিকাংশই নির্বাচনী আধিকারিকদের ডিজিটাল স্বাক্ষর-সহ তৈরি হয় এবং অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদন দুটিতে আরও প্রকাশ করা হয়েছে, উত্তরপ্রদেশের তারাবগঞ্জ ও পিলিভীত—এই দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য দাখিল করা আপত্তির প্রায় ৯০ শতাংশই মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে ছিল। তারাবগঞ্জে ‘রেশমা’ নাম ব্যবহার করে ১৮৮টি আপত্তি দাখিল করা হয়েছিল। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই আপত্তিগুলি একই দিনে এবং একই ভোটকেন্দ্রের ভোটারদের বিরুদ্ধে জমা পড়েছিল।
এই তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং গণহারে আপত্তি দাখিলের প্রক্রিয়া কি নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের—বিশেষত মুসলিমদের—ভোটাধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে?
৮৫,৮৫৪টি ফর্মে নাম বাদ দেওয়ার কোনও স্পষ্ট কারণ ছিল না
দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ ৯ অক্টোবর তাদের প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফর্ম-৭-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত কোনও ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার জন্য আপত্তি জানাতে ফর্ম-৭ ব্যবহার করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যে এসআইআর চলাকালীন মোট ৪.৩ লক্ষেরও বেশি ফর্ম-৭ জমা পড়েছিল। তথ্য বিশ্লেষকদের সহায়তায় এই ফর্মগুলি পরীক্ষা করে দেখা যায়, তার মধ্যে ৮৭,১২৭টি আবেদন দাখিল করেছিলেন নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক (ইআরও) এবং সহকারী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকরা (এইআরও)।
এই ৮৭,১২৭টি আবেদনের মধ্যে ৮৫,৮৫৪টি, অর্থাৎ প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ ফর্মে ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার কোনও কারণ উল্লেখ করা হয়নি। আরও ৬২টি ফর্মে কারণের জায়গায় শুধু ইংরেজি অক্ষর ‘A’, ‘N’, ‘H’ অথবা ‘E’ লেখা ছিল। ১,২১১টি ফর্মে ‘অনুপস্থিত/স্থানান্তরিত’ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই ৮৭,১২৭টি আবেদন ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিলের মধ্যে মাত্র ১৯ দিনে জমা পড়েছিল।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এত বিপুল সংখ্যক ফর্মে কারণ উল্লেখ না থাকার বিষয়টি কোনও একজন আবেদনকারীর বিচ্ছিন্ন ভুল ছিল না। এর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ইআরওনেট (ERONET) সফটওয়্যারের কার্যপদ্ধতির সম্পর্ক ছিল।
কীভাবে আধিকারিকদের নামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফর্ম তৈরি হয়েছিল?
দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ বিধানসভা স্তরের চারজন নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসআইআর শুনানির সময় কোনও ভোটারের নথি যাচাই করা না গেলে এবং তাঁর নাম অনুমোদন না করা হলে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ফর্ম-৭ তৈরি করত।
একজন আধিকারিক জানান, শুনানির সময় কোনও ভোটারকে অনুমোদন না দিলেই সিস্টেম নিজে থেকে ফর্ম-৭ তৈরি করে দিত। যেহেতু সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের সরকারি লগ-ইন ও পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো, তাই ফর্মে তাঁর ডিজিটাল স্বাক্ষরও যুক্ত হয়ে যেত।
ফলে যে আধিকারিকের দায়িত্ব ছিল ভোটারের দাবি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, তিনিই সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদনের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরকারী হয়ে উঠতেন।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের আধা-বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা রয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়, তাঁরা প্রমাণ ও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন।
কিন্তু সফটওয়্যার যদি কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য এমন ফর্ম তৈরি করে, যেখানে স্পষ্ট কারণ উল্লেখ থাকে না, তাহলে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আইন ও নির্বাচন কমিশনের নিয়ম কী বলছে?
দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা থেকে কোনও ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। ফর্ম-৭ জমা দেওয়ার সময় আবেদনকারীকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য নির্ধারিত কারণগুলির মধ্যে প্রযোজ্য কারণটি বেছে নিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভোটারের মৃত্যু, নির্ধারিত বয়সসীমা পূরণ না করা, স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া, একাধিক জায়গায় নাম নথিভুক্ত থাকা অথবা ভারতীয় নাগরিক না হওয়া।
এ ছাড়া, এসআইআর সংক্রান্ত নির্বাচনী নির্দেশের উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, কোনও আধিকারিক নিজের উদ্যোগে কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলে তাঁকে লিখিত আদেশে তার কারণ উল্লেখ করতে হয়। আইনি পরিভাষায় একে ‘স্পিকিং অর্ডার’ বলা হয়, অর্থাৎ এমন আদেশ যেখানে সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি স্পষ্টভাবে লেখা থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টরস রুলস, ১৯৬০-এও নির্ধারিত পদ্ধতি ও শর্ত মেনে আপত্তি জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার আধিকারিকদের এমন ফর্মে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছিল, যেখানে নাম বাদ দেওয়ার কোনও স্পষ্ট কারণ ছিল না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ফর্মগুলি দাবি ও আপত্তি জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দাখিল করা হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয় ১০ এপ্রিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধিকারিকদের মাধ্যমে দাখিল করা ৮৭,১২৭টি আবেদন ১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিলের মধ্যে জমা পড়ে। পাশাপাশি, ব্যক্তিগত আবেদনকারীদের মাধ্যমে ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য জমা পড়া ১,১০,৪৭৬টি আবেদনও নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর গ্রহণ করা হয়েছিল।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভোটার তালিকা থেকে কোনও নাগরিকের নাম বাদ দেওয়া শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এর সঙ্গে তাঁর ভোটাধিকার সরাসরি যুক্ত।

দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে গণহারে আপত্তি
দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যায় আপত্তি দাখিল করা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারাবগঞ্জ ও পিলিভীত বিধানসভা কেন্দ্রে ফর্ম-৭-এর মাধ্যমে দাখিল করা আপত্তির প্রায় ৯০ শতাংশই মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য করা হয়েছিল।
তারাবগঞ্জে ‘রেশমা’ নাম ব্যবহার করে ১৮৮টি আপত্তি দাখিল করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সবকটি আপত্তি একই দিনে এবং একই ভোটকেন্দ্রের ভোটারদের বিরুদ্ধে জমা পড়েছিল।
এই ঘটনা প্রশ্ন তুলছে, ব্যক্তিগতভাবে আপত্তি জানানোর আইনি ব্যবস্থাকে কি বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম একসঙ্গে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে?
তবে প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতার কথাও বলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্যভান্ডারে আপত্তি দাখিলকারীদের পরিচয়সংক্রান্ত সম্পূর্ণ বিবরণ ছিল না; শুধু তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে আবেদনকারীদের স্বাধীনভাবে শনাক্ত করা এবং তাঁদের সম্পর্কে তথ্য যাচাই করা কঠিন।
তাই এই তথ্যকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবির প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। শুধু পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রতিটি আবেদনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায় না। কিন্তু একই নাম ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক আপত্তি এবং নির্দিষ্ট এলাকায় মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিকভাবে বেশি আপত্তি দাখিলের ঘটনা স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে।

মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের প্রতিক্রিয়া: প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর বললেও প্রশ্নের জবাব মেলেনি
৯ অক্টোবর প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরপরই উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নবদীপ রিনওয়া সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রতিবেদনটিকে ‘মিথ্যা দাবি ও ভুল তথ্যে ভরা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি ওই দিনই এর জবাব প্রকাশ করার কথা জানান।
পরে একটি ভিডিও বিবৃতিতে তিনি প্রতিবেদনটিকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেন। তবে দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের ১৪ অক্টোবরের পরবর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্যে এই মূল তথ্যটি খণ্ডন করা হয়নি যে নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার ৮৫,৮৫৪ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য এমন ফর্ম তৈরি করেছিল, যেখানে কোনও স্পষ্ট কারণ উল্লেখ ছিল না।
অধিকাংশ ফর্মে কেন নাম বাদ দেওয়ার কারণ লেখা হয়নি, কিংবা কয়েকটি ফর্মে কেন মাত্র একটি অক্ষরকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, তারও ব্যাখ্যা দেননি মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক।
রিনওয়া মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে গণহারে আপত্তি দাখিলের বিষয়টিও স্বীকার করেন। তবে তিনি একে গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখার পরিবর্তে রাজ্যের মোট ভোটারের সংখ্যার তুলনায় খুবই কম বলে দাবি করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণহারে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগের আওতায় প্রায় ৪,৭০০ জন ভোটারের নামের বিরুদ্ধে একাধিক ফর্ম-৭ জমা পড়েছিল। অথচ রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ১৩.৩৯ কোটি। তাঁর যুক্তি, এই বিপুল সংখ্যার তুলনায় সংশ্লিষ্ট ভোটারের সংখ্যা খুবই কম।
কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণহারে আপত্তির গুরুত্ব শুধু মোট ভোটারের সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না। আপত্তিগুলি কোথায়, কোন যুক্তিতে এবং কাদের বিরুদ্ধে দাখিল করা হয়েছে, সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভোটাররা নিজেদের বক্তব্য জানানোর যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
এক মাসে সর্বাধিক ৩০টি আপত্তির সীমা কেন চালু করল নির্বাচন কমিশন?
১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ জানিয়েছে, ৯ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন নতুন নির্দেশ জারি করে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি এক মাসে ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ৩০টির বেশি আপত্তি দাখিল করতে পারবেন না।
অনুসন্ধানী সংস্থার দাবি, এর আগে এসআইআর-এর নিয়ম থেকে গণহারে আবেদন জমা দেওয়ার সীমা তুলে নেওয়া হয়েছিল। নতুন নির্দেশের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থায় আবার পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, যদি আগের ব্যবস্থা যথেষ্ট ও নিরাপদ ছিল, তাহলে গণহারে আপত্তি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আবার সীমা নির্ধারণের প্রয়োজন হলো কেন? আর যদি এই ব্যবস্থার অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকে থাকে, তাহলে আগে সেই সীমা তুলে নেওয়া হয়েছিল কেন?
তবে নতুন সীমা চালু করার অর্থ এই নয় যে নির্বাচন কমিশন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সমস্ত অভিযোগ মেনে নিয়েছে। তা সত্ত্বেও, প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই নিয়মে পরিবর্তন নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে আরও ব্যাখ্যার দাবি জানায়।
এসআইআর-এ কতজন ভোটারকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল?
দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের ৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশে এসআইআর চলাকালীন নির্বাচন কমিশন ৩.২৬ কোটি ভোটারকে ‘যৌক্তিক অসংগতি’ (Logical Discrepancies) অথবা ‘আনম্যাপড রেকর্ড’ (Unmapped) হিসেবে অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত করেছিল। তাঁদের পরিচয় ও ভোটার হিসেবে নিবন্ধন যাচাই করতে শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়।
এর আগে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ২.৮৯ কোটি ভোটারের নাম অনুপস্থিত, অন্যত্র স্থানান্তরিত, মৃত অথবা একাধিক জায়গায় নাম নথিভুক্ত থাকার মতো কারণে যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল।
১০ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় প্রায় ১৩.৪ কোটি ভোটারের নাম ছিল। কিন্তু প্রতিবেদন অনুযায়ী, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময় মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জানাননি, শুনানির পর কতজনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং কতজনকে ‘আনম্যাপড’ বা ‘যৌক্তিক অসংগতি’র শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও এই দুই শ্রেণিতে বাদ পড়া ভোটারের পৃথক সংখ্যা প্রকাশ করেননি।
এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তা না জানা গেলে নাগরিক, রাজনৈতিক দল এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের পক্ষে প্রকৃত ভোটারদের কতজনের নাম বাদ পড়েছে, কতগুলি সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে এবং কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর এই প্রক্রিয়ার অসম প্রভাব পড়েছে কি না, তা নির্ণয় করা কঠিন।
নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ভোটাধিকারের প্রশ্ন
উত্তরপ্রদেশে এসআইআর চলাকালীন প্রকাশ্যে আসা এই তথ্যগুলি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলেছে।
যদি সফটওয়্যার কোনও আধিকারিকের নামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন তৈরি করে, তাতে ডিজিটাল স্বাক্ষর যুক্ত হয়ে যায় এবং আবেদনে স্পষ্ট কারণ উল্লেখ না থাকে, তাহলে এই প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতা ও দায়িত্ব কার? সংশ্লিষ্ট ভোটার কি জানতে পারবেন, কেন তাঁর নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে? আর তিনি সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইলে কোন ভিত্তিতে আপিল করবেন?
একইভাবে, কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে যদি বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোটারের বিরুদ্ধে আপত্তি দাখিল করা হয়, তাহলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু ভোটার তালিকা তৈরি করা নয়, বরং এটাও নিশ্চিত করা যে কোনও নাগরিককে যথাযথ কারণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়া ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা না হয়।
এটাও স্পষ্ট রাখা দরকার যে দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের অনুসন্ধানে উঠে আসা পরিসংখ্যান নিজেরাই প্রমাণ করে না যে বাদ পড়া প্রত্যেক ভোটার যোগ্য ছিলেন অথবা প্রতিটি আপত্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। কিন্তু কোনও কারণ ছাড়াই বিপুল সংখ্যক ফর্ম তৈরি হওয়া, মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে গণহারে আপত্তি এবং বাদ পড়া নামগুলির সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ না করার মতো বিষয়গুলির ব্যাখ্যা নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছভাবে দিতে হবে।
উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা ও নিরপেক্ষতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে প্রতিটি ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্পষ্ট কারণ, যাচাইযোগ্য নথি এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
