জাতীয়তাবাদের বাহ্যিক ও প্রতীকী প্রকাশ কোনও ব্যক্তির রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কতটা গভীর, তার মাপকাঠি হতে পারে না।
সুমন নারাং
‘জাতীয় মর্যাদা অবমাননা (সংশোধনী) আইন, ২০২৬’, যা মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়েছে, তার অধীনে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা বা এর অবমাননা করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই আইন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের প্রতি আনুগত্যের বিচার কি সাংবিধানিক নীতির কঠোর অনুসরণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, নাকি সেই সব কাজের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, যেগুলিকে আইনগতভাবে ‘দেশপ্রেম’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে?
মঙ্গলবার সরকার ঘোষণা করেছে যে ১৫ আগস্ট লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হবে।
নতুন আইনের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের জাতীয় মর্যাদা অবমাননা আইনে সংশোধন আনা হয়েছে, যাতে ‘বন্দে মাতরম’-কে আইনি সুরক্ষা দেওয়া যায়। ১৮৭৫ সালে রচিত এই গানটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেউ কখনও বলেনি যে বন্দে মাতরম সম্মানের যোগ্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কি আইনের বাধ্যতামূলক বিধান হয়ে যাওয়া উচিত?
১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত গণপরিষদ স্বাধীনতা আন্দোলনে এই গানের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা বিবেচনা করে ‘জন গণ মন’-কে জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। গণপরিষদ সচেতনভাবেই জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় গানের মধ্যে পার্থক্য রেখেছিল।
গণপরিষদের সদস্যরা ভালোভাবেই জানতেন যে জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপটে ‘বন্দে মাতরম’-এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কিন্তু এই গানের কিছু অংশে এমন ধর্মীয় রূপক ও প্রতীক রয়েছে, যার সঙ্গে কিছু সম্প্রদায়ের পক্ষে নিজেদের সম্পৃক্ত করা কঠিন হতে পারে। একরূপতা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে গণপরিষদ নমনীয়তার পথ বেছে নিয়েছিল। নতুন আইন থেকে মনে হচ্ছে, জাতীয় প্রতীকগুলির জন্য প্রণীত অন্যান্য আইনের মতো জাতীয় গানের ক্ষেত্রেও সেই ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যেখানে আইন লঙ্ঘনের জন্য ফৌজদারি শাস্তির বিধান রয়েছে।
গণপরিষদের বিতর্কের সময় তার চেয়ারম্যান ড. বি. আর. আম্বেদকর সেই পরিস্থিতিরই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, যার মুখোমুখি আজ ভারত। তিনি বলেছিলেন, ‘‘সাংবিধানিক নৈতিকতা কোনও স্বাভাবিক অনুভূতি নয়; এটিকে গড়ে তুলতে হয়।’’
তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে এই ধরনের নৈতিক মূল্যবোধের অভাবের জন্য শাস্তি দেওয়ার আইন তৈরি করা তার বিকাশের আদর্শ পদ্ধতি নয়। বরং শিক্ষা এবং সামাজিক স্তরে যুক্তি ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে এই মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। আইন মানুষকে তা মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে সংবিধানের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তৈরি করতে পারে না।
গত ১০ বছরে জনপরিসরের বিতর্ক অনেকটাই কেন্দ্রীভূত হয়েছে দেশপ্রেমের ব্যবহারিক প্রকাশ কীভাবে ঘটবে এবং সেটিকে সাংবিধানিক আনুগত্যের প্রমাণ হিসেবে কীভাবে দেখা হবে, সেই প্রশ্নের ওপর। এর একটি উদাহরণ হল, ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট সিনেমা শুরু হওয়ার আগে প্রেক্ষাগৃহে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো বাধ্যতামূলক করেছিল। যদিও দুই বছর পর সেই নির্দেশকে ঐচ্ছিক করে দেওয়া হয়। এখানে নাগরিকদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব থেকে সরে এসে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকদের ওপর দেশপ্রেমের বাহ্যিক প্রকাশ ঘটানোর জন্য চাপ বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
এই ক্ষেত্রে ভারত একা নয়। স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাটের লেখা ‘How Democracies Die’ এবং টম গিন্সবার্গ ও আজিজ হকের লেখা ‘How to Save a Constitutional Democracy’ অনুযায়ী, গণতন্ত্রের পতন একটি ধীর ও ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানো এবং ভিন্নমতের জন্য উপলব্ধ পরিসর সংকুচিত করতে আইনের সাহায্য নেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গণতান্ত্রিক একরূপতা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য প্রতীকী জাতীয়তাবাদকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কাগজে-কলমে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় প্রতীককে জবরদস্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদানকারী একাধিক রায় দিয়েছে। ১৯৮৬ সালের ‘বিজো এম্যানুয়েল বনাম স্টেট অব কেরালা’ মামলায় আদালতের রায় বিবেকের স্বাধীনতার নীতির গুরুত্বকে তুলে ধরেছিল। এই মামলাটি ‘জিহোভাস উইটনেসেস’ (Jehovah’s Witnesses) ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে ছিল। জাতীয় সঙ্গীত না গেয়ে, তবে তার প্রতি সম্মান জানিয়ে মর্যাদার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তাদের স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, তাদের ধর্ম কেবল যিহোবার উপাসনার অনুমতি দেয় এবং অন্য কোনও সত্তার প্রতীকী প্রশংসা বা বন্দনা করার অনুমতি দেয় না।
আদালত বলেছিল, দেশের প্রতি ভালোবাসা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনও কাজের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। এই রায়ে জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে সংবিধানের প্রতি আনুগত্যই মৌলিক বিষয় এবং সাংবিধানিক স্বাধীনতার সীমার মধ্যে ভিন্নমতও গ্রহণযোগ্য।
‘জাতীয় মর্যাদা অবমাননা (সংশোধনী) আইন, ২০২৬’ শুধু তার উদ্দেশ্য নয়, এর আইনি খসড়া প্রণয়ন নিয়েও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এই সংশোধনী এমন ব্যক্তিকে অপরাধী সাব্যস্ত করার বিধান করেছে, যে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার ক্ষেত্রে ‘‘ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেয় অথবা গানটিতে অংশগ্রহণকারী জনসমাবেশের জন্য বিঘ্ন সৃষ্টি করে’’। কিন্তু আইনটি কোথাও স্পষ্ট করে না যে এই ধরনের বাধা বা বিঘ্ন বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে। ফলে প্রশ্ন তৈরি হয়—এই আইনি দায়বদ্ধতা কি শুধু শারীরিক বাধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নীরবভাবে অংশগ্রহণ না করা, প্রতিবাদ, বক্তৃতা বা মতপ্রকাশের অন্যান্য রূপও এর আওতায় পড়বে? কেউ যদি ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ায় নীরবে অংশগ্রহণ না করেন, তাহলে কি তা ইচ্ছাকৃতভাবে গানটির পরিবেশনে বাধা দেওয়া হিসেবে গণ্য হবে? গানটি গাওয়ার সময় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কি কোনও বিঘ্ন হিসেবে বিবেচিত হবে?
২০১৫ সালে ‘শ্রেয়া সিংহল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬A ধারা অন্যান্য কারণের পাশাপাশি এই কারণে বাতিল করেছিল যে ধারাটি ছিল অস্পষ্ট এবং অতিরিক্ত বিস্তৃত। আদালত বলেছিল, অস্পষ্ট ফৌজদারি বিধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকে অতিরিক্ত বিবেচনামূলক ক্ষমতা দিয়ে দেয়, যার ফলে সুরক্ষিত মতপ্রকাশের ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এখানেও একই ধরনের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার ক্ষেত্রে ‘‘ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেওয়া’’ বা ‘‘বিঘ্ন সৃষ্টি’’ বলতে কী বোঝানো হবে, তার কোনও সুস্পষ্ট আইনি সীমা না থাকায় নতুন আইনটি নাগরিক এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা—উভয়কেই ফৌজদারি আইনের আওতার পরিধি নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে।
১৯৭১ সালের মূল জাতীয় মর্যাদা অবমাননা আইন আইন প্রণয়নে সংযম ও ভারসাম্যের একটি উদাহরণ। সংসদ স্বীকার করেছিল যে জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মূল্য দেওয়া উচিত নয়।
এই আইনের উদ্দেশ্য ও কারণের বিবৃতিতে (Statement of Objects and Reasons) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এর উদ্দেশ্য জাতীয় প্রতীক নিয়ে সৎ ও সদুদ্দেশ্যপূর্ণ সমালোচনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়। এমনকি এই আইন মানুষকে সংবিধান ও জাতীয় পতাকায় পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগও দেয়, যদি সেই পরিবর্তন আইনসম্মত পদ্ধতিতে করা হয়। বর্তমান নতুন আইনে এই ধরনের কোনও সুরক্ষা বা ব্যতিক্রম রাখা হয়নি। এই সীমাবদ্ধতামূলক ভাষার অনুপস্থিতির কারণে অপরাধের পরিধি অনেকটাই প্রশাসনিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বন্দে মাতরমকে অবশ্যই যথাযোগ্য সম্মান জানানো উচিত। কিন্তু সেই সম্মান কার্যকর করার জন্য কি ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত? একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রে সর্বোচ্চ আনুগত্য থাকা উচিত সংবিধান এবং তার মৌলিক মূল্যবোধ—স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচারের প্রতি। যখন জাতীয় প্রতীকের প্রতি আনুগত্যকে শাস্তির ভয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন তা নাগরিকদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের আনুগত্যে পরিণত হয়।
কোনও গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা তার শক্তি এই কারণে অর্জন করে না যে, সে নাগরিকদের দেশপ্রেম প্রকাশের কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়। বরং তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সেই স্বাধীনতা রক্ষার মধ্যে, যা নাগরিকদের সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থেকে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করা অথবা তা প্রকাশ না করার সুযোগ দেয়। সংবিধান সম্মান ও আনুগত্যের যোগ্য, কারণ এটি তার সকল নাগরিককে সুরক্ষা দেয়—তাদেরও, যাদের দেশপ্রেম প্রকাশের ধরন তুলনামূলকভাবে কম আবেগপ্রবণ হতে পারে।
(লেখিকা সুমনভি নারাং, জিন্দল গ্লোবাল ল স্কুল, ও. পি. জিন্দল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিতে আইনের সহকারী অধ্যাপক।)