নয়াদিল্লি: সুপ্রিম কোর্ট শুক্রবার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) কর্মসূচির সময় কোনো ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তার ভারতীয় নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। আদালত জোর দিয়ে বলেছে যে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) নাগরিকত্ব নির্ধারণের কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই। তবে শুনানির সময় আবেদনকারীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বহু মানুষকে রেশন, পেনশন এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। আবেদনকারী এই বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ ও অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা চাইলেও আদালত এই পর্যায়ে কোনো পৃথক অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি করেনি।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনের বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গে SIR অভিযানের সময় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের জন্য আপিল প্রক্রিয়ার সংস্কার সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি করছিল।
শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী “বিহার SIR” রায়ের উল্লেখ করে বলেন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী কেন্দ্র সরকারের।
বিচারপতি বাগচী মন্তব্য করেন:
“নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্বের বিষয়ে কোনো সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ নয়। তারা কারও নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করা বা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু তার ফলে ওই ব্যক্তির নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না।”
আদালত আরও জানায়, যদি নির্বাচন কমিশন সন্দেহজনক নাগরিকত্বের ভিত্তিতে কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়, তবে সেই বিষয়টি নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা কেন্দ্র সরকারের কাছে পাঠাতে হবে। যতক্ষণ না কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব বহাল থাকবে।
আবেদনকারী প্রসেনজিৎ বসুর পক্ষে উপস্থিত সিনিয়র আইনজীবী গোপাল শঙ্কর নারায়ণন আদালতকে জানান যে, সুপ্রিম কোর্টের আগের স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বহু মানুষ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি জানান, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালের সামনে প্রায় ৩৪ লক্ষ আপিল বিচারাধীন রয়েছে, অথচ এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৩৮ হাজার আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে। তাঁর দাবি, নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলির প্রায় ৭০ শতাংশ আবেদনকারীর পক্ষে গিয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে বাতিল হতে পারে।
গোপাল শঙ্কর নারায়ণন আরও দাবি করেন যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জনবণ্টন ব্যবস্থা (PDS), অন্নপূর্ণা যোজনা এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক সুবিধার পাশাপাশি জাতিগত শংসাপত্র (Caste Certificate) প্রদানের ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি করছে সেইসব মানুষের জন্য, যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যদিও তাদের আপিল এখনও বিচারাধীন।
তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেন যে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত দাবি ও আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে নাগরিক অধিকার ও কল্যাণমূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়—এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হোক।
সিনিয়র আইনজীবী আপিল প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি জানিয়ে বলেন, বিপুল সংখ্যক বিচারাধীন মামলার পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা প্রয়োজন। তিনি আরও যুক্তি দেন যে বৈধ পাসপোর্টকে সাধারণভাবে নাগরিকত্বের শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
তবে বেঞ্চ স্মরণ করিয়ে দেয় যে “বিহার SIR” মামলায় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করা হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নাগরিকত্ব হারানোর সমতুল্য নয় এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা শুধুমাত্র সন্দেহজনক মামলাগুলি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
পরবর্তীতে আদালত এই মামলাটিকে পশ্চিমবঙ্গে চলমান SIR অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করা অন্যান্য বিচারাধীন মামলার সঙ্গে ট্যাগ করে দেয়।
অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ড নেহা রাঠির মাধ্যমে দায়ের করা আবেদনে আপিল প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, সহজলভ্য ও কার্যকর করার জন্য একাধিক নির্দেশ জারির আবেদন জানানো হয়েছে।
আবেদনে আপিলকারীদের ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজিরার অনুমতি, শুনানির নোটিশ ইলেকট্রনিক ও মুদ্রিত—উভয় মাধ্যমেই সময়মতো প্রেরণ, এবং আগামী নির্বাচনের আগে সমস্ত আপিল নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় আপিল প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একটি সহজ নির্দেশিকা প্রকাশ, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ও বর্জনের বিধানসভা-ভিত্তিক তথ্য প্রকাশ, ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ এবং SIR প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) জনসমক্ষে আনার দাবিও জানানো হয়েছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার SIR-এর ফলাফলের ভিত্তিতে জনবণ্টন ব্যবস্থার (PDS) উপভোক্তাদের যোগ্যতা যাচাই শুরু করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপে এমন হাজার হাজার মানুষ প্রভাবিত হতে পারেন যাদের নাম ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
অন্যদিকে কলকাতা-ভিত্তিক সবর ইনস্টিটিউট-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে SIR অভিযানের সময় “আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন” শ্রেণিতে রাখা ২৭ লক্ষেরও বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৭০.১৭ শতাংশ মুসলিম, এবং মহিলাদের অংশ ৫১ শতাংশ।
গবেষণা অনুযায়ী, অধিকাংশ ভোটারকে তথাকথিত “লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি” বা যৌক্তিক অসঙ্গতির ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাবা-মা ও সন্তানের নামের বানানে অসঙ্গতি, বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে কম বয়সের ব্যবধান, অথবা একই পরিবারে ছয়জনের বেশি সন্তানের নাম নথিভুক্ত থাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রাথমিক চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে ৬১ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে সম্পূরক তালিকা এবং প্রায় ৬০ লক্ষ “সন্দেহভাজন” বা “বিচারাধীন” মামলার যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
সবর ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মোট প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে, যা সংশোধন প্রক্রিয়া শুরুর আগে রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১১.৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রায় ৩৪ লক্ষ আপিল বিভিন্ন আপিল ট্রাইব্যুনালের সামনে বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ আপিল করেছিলেন সেইসব ব্যক্তি, যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার আওতায় গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলি এখন পর্যন্ত মাত্র ১,৬০৭ জনের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দিয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলি SIR অভিযানের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একই সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, যাচাইয়ের মানদণ্ড এবং আপিল ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন প্রশ্নও সামনে এনেছে।