সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ধর্মতলা মামলায় বড় স্বস্তি
গ্রেফতার ১৬ বিক্ষোভকারী জামিনে মুক্ত; বিহার ও অসম মামলা প্রত্যাহার করেছে, পশ্চিমবঙ্গ এখনও নীরব
কলকাতা: ২৪ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে হওয়া বিক্ষোভে সংঘর্ষের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৬ জনকেই জামিন দিয়েছে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। মঙ্গলবার আদালত প্রত্যেককে ৫০০ টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে জামিন মঞ্জুর করে।
ঘটনাটি নাটকীয় মোড় নেয়। একই দিন দুপুরে আদালত ১৬ জনকেই দু’দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে (জেল কাস্টডি) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় পুনরায় শুনানির পর সেই সিদ্ধান্ত বদলে তাদের জামিন দেওয়া হয়। দুপুরের শুনানিতে সরকারি আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করলেও সন্ধ্যার শুনানিতে তিনি আর আপত্তি জানাননি।
লালবাজার সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ যে মামলায় এই ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছিল, সেই মামলাটি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে মূল আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে। পরে বিহার, অসম, মহারাষ্ট্র-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। গত শুক্রবার কলকাতার ধর্মতলায় বিক্ষোভ মিছিল চলাকালীন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, কয়েকজন বিক্ষোভকারী সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়, যাতে একাধিক সাংবাদিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এই ঘটনার জেরেই ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র বৈঠক হয়। সেখানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব মামলা প্রত্যাহার এবং NEET কেলেঙ্কারির জেরে আত্মহত্যা করা ছাত্রদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার দাবিতে নীতিগত সম্মতি হয়। এরপর CJP দেশজুড়ে চলা আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
তবে সোমবার CJP অভিযোগ করে, কেন্দ্র সরকার মামলা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি পালন করছে না। এরপর আবারও কেন্দ্র ও CJP-র মধ্যে বৈঠক হয়, যেখানে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিহার ও অসম সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তি জারি করে।
মঙ্গলবার সকালে দিল্লিতে ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, যেসব নাবালক গ্রেফতার হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মামলা প্রত্যাহার নিয়ে কোনো স্পষ্ট অবস্থান জানানো হয়নি।
ধর্মতলার ঘটনায় হেয়ার স্ট্রিট ও এন্টালি থানায় মোট আটটি এফআইআর দায়ের করা হয়। এর মধ্যে একটি পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত (Suo Motu) হয়ে দায়ের করে এবং বাকি সাতটি ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে নথিভুক্ত হয়।
গ্রেফতার হওয়া ১৬ জনকে হেয়ার স্ট্রিট থানার মামলা নম্বর ১৫২/২৬ অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয়েছিল।
মঙ্গলবার দুপুরের শুনানিতে সরকারি আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করলে আদালত তাদের ৩০ জুলাই পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। পরে সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কপি আদালতে জমা পড়ার পর অভিযুক্তদের আইনজীবী ইয়াসিন রহমান, রাজা সেন এবং প্রশান্ত বাগচী পুনরায় শুনানির আবেদন জানান, যা আদালত গ্রহণ করে।
শুনানির সময় তদন্তকারী অফিসার আদালতকে জানান, গ্রেফতার ১৬ জনের মধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধমূলক অভিযোগ রয়েছে। তখন প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা প্রশ্ন তোলেন, ওই পাঁচজনকে কি কোনো আদালত দোষী সাব্যস্ত করেছে? সরকারি আইনজীবী এর স্পষ্ট উত্তর দিতে না পারায় ম্যাজিস্ট্রেট ১৬ জনকেই জামিন মঞ্জুর করেন।
জামিনে মুক্তির পর আদালতের বাইরে কর্মী-সমর্থকেরা ফুলের মালা পরিয়ে তাদের স্বাগত জানান।
রাতের দিকে লালবাজার সূত্রে জানা যায়, পুলিশের করা মামলাটি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে নবান্নের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করা হয়নি।
যদিও বিহার ও অসম সরকার মামলা প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়।
অভিযুক্তদের আইনজীবী ইয়াসিন রহমান বলেন, “বিহার ও অসমের মতো পশ্চিমবঙ্গে এখনও মামলা প্রত্যাহার নিয়ে কোনো সরকারি নির্দেশ জারি হয়নি।”
অন্যদিকে, পুলিশের দাবি, ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া বাকি সাতটি মামলার তদন্ত এখনও চলবে।